গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইক । এসব বন্ধে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও অদৃশ্য আশীর্বাদে চলছে এসব যান। ঢাকায় এসব চলাচলের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা থাকায় গড়ে উঠেছে চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট। ঢাকার কেরাণীগঞ্জ, সাভার, নবাবগঞ্জ ও দোহার উপজেলায় প্রায় দুই লাখ ব্যাটারী চালিত অটোরিক্সা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। হাইকোর্টের নির্দেশনা থাকায় এখন চাপে রয়েছেন গ্যারেজ মালিকরা। স্থানীয় কিছু অসৎ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাশোয়ারা দিয়ে এসব অবৈধ রিক্সা চলাচল করছে। এছাড়া রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, মোহাম্মদপুর, আবদুল্লাহপুর,হাজারীবাগসহ ঢাকার বেশিরভাগ অলিগলি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এসব বাহন।
অভিযোগ আছে, স্থানীয় প্রভাবশালীদের ইন্ধনেই চলছে অবৈধ এসব যান। প্রতিমাসে মাসোয়ারা দিতে হয় রিক্সা মালিকদের। এছাড়া দেশের বেশিরভাগ জেলাতেই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ব্যাটারি চালিত রিকশা, ভ্যান ও ইজিবাইক। এসব যানবাহন চার্জ করতে বৈধ-অবৈধ উপায়ে গড়ে উঠেছে অসংখ্য গ্যারেজ। প্রতিদিন বিদ্যুতের একটি বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে এসব যানবাহনের পেছনে। অথচ বিদ্যুতের অপচয় বাড়লেও তা বন্ধে নেই কোন তৎপরতা। বগুড়া শহরসহ, সিটি করপোরেশনের হিসাবে খুলনায়, রাজশাহী মহানগরীতে এবং একই অবস্থা বরিশাল, সিলেট, রংপুর, টাঙ্গাইল, লক্ষ্মীপুর, সাতক্ষীরা, পাবনাসহ সারাদেশেই। অনুমতিহীন এসব যানবাহন বন্ধ করা গেলে বিদ্যুত অপচয়ের একটি বড় অংশই বাঁচানো সম্ভব বলে মনে করেন বিশিষ্টজনরা। ব্যাটারি চালিত এসব যানবাহনের ওপর বুয়েটের গবেষণা দেখা যায় ,দেশে প্রায় ১০ লাখের বেশি ব্যাটারিচালিত যানবাহনে দিনে বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে অন্তত এক হাজার মেগাওয়াট।
সরকার যদি ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশাকে দেশে দ্রুত বৈধ চালু উৎসাহিত করতে চায়, তাহলে আজই এগুলোর চলাচলকে আইনগতভাবে বৈধতা করেসর্বাগ্রে বিবেচনায় রাখতে হবে। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বৈধতা এখন সময়ের দাবি । দেশজুড়ে অবৈধভাবে চলা বিদ্যুতচালিত যানবাহনগুলোকে একটি নিয়মের মধ্যে এনে বৈধতা দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এজন্য একটি খসড়া নীতিমালা তৈরি করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। তাতে বলা হয়েছে, ইলেক্ট্রিক মোটরযান চালাতে হলে বিআরটিএ থেকে নিবন্ধন নিতে হবে; থাকতে হবে ফিটনেস সনদ, ট্যাক্স টোকেন।
বেসরকারী বিভিন্ন সংগঠনের তথ্য হলো ইজিবাইকের সংখ্যা ১১ লাখের বেশি। ব্যাটারিচালিত রিক্সাসহ নতুন নতুন মডেলের আরও কিছু ব্যাটারিচালিত পরিবহন রয়েছে। শুধু ইজিবাইকই আমদানি করা হয়েছে ১০ লাখের বেশি। সব মিলিয়ে ঢাকায় তিন চাকার যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ। সারা দেশে বর্তমানে ব্যাটারিচালিত ৪০ লাখ ইজিবাইক ও অটোরিকশা রয়েছে বলে গত ফেব্রুয়ারিতে সংসদে জানিয়েছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী। ঢাকায় এই সংখ্যা ১২ লাখের বেশি। এর মধ্যে ১০ লাখ রিকশা বাকি ২ লাখ ইজিবাইক। ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত তিন চাকার গাড়িকে নিবন্ধন দেয় না সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। ইলেক্ট্রিক মোটরযানের নিবন্ধন ও ফিটনেস সার্টিফিকেট ও ট্যাক্সটোকেন এবং রুট পারমিট দেয়ার প্রক্রিয়া ইঞ্জিনচালিত মোটরযানের মতোই হবে। ভাড়ায় চালিত ইলেক্ট্রিক মোটরযানকে আঞ্চলিক পরিবহন কমিটির কাছ থেকে রুট পারমিট নিতে হবে। যা এই ইজিবাইক এবংঅটোরিকশার কোনটাই নাই ! সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈধতা পেলে প্রতিদিন প্রয়োজন হবে ৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুত। এগুলোর ডিজাইন এবং ফিটনেস পরীক্ষা করে ঝুঁকিপূর্ণ মনে হওয়ায় নিবন্ধন ও রুট পারমিট দেওয়া হয়নি। একটু ঝাঁকুনি লাগলেই উল্টে যায়। ব্যাটারিচালিত তিন চাকার বাহনগুলো কমপক্ষে শতকরা ১৫ শতাংশ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। অটোর চালকরা যে কোন সময় যেখানে সেখানে ব্রেক করে দাড়িয়ে পড়ছে। ফলে বাড়ছে যানজটও। এসব রিক্সা কোন লাইসেন্স ছাড়াই চলছে নির্বিঘ্নে।
ব্যাটারি চালিত রিক্সা দূষণের বড় সমস্যা হলো, এখন যেসব ব্যাটারিচালিত যান চলছে সেগুলো লেড অ্যাসিড ব্যাটারির, যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। বলা হচ্ছে, এগুলো ২০২৫ সাল নাগাদ শেষ হয়ে যাবে এবং এমন সব যানই তখন লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির প্রযুক্তিতে চলে যাবে এবং তখন এসব পরিবহন পরিবেশবান্ধব হয়ে উঠবে। আর ও বিপদজনক খবর হলো মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া ব্যাটারিগুলি যেখানে -সেখানে ফেলে দেওয়া হয়। বিষাক্ত কিছু ধাতু দিয়ে প্রস্তুত করা হয় ব্যাটারি এর মধ্যে আছে নিকেল,ক্যডমিয়াম,পারদ, সীসা এগুলো পরিবেশ এবং স্বাস্থ্যর জন্য খুবই ক্ষতিকারক।এক গবেষণায় জানা গেছে,মেয়াদহীন বা Expired Battery গুলোও পরিবেশের উষ্ণতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। ব্যাটারিগুলো মাটির বাস্তুসংস্থানের উপর ও প্রভাব ফেলে, বিভিন্ন ভাবে বায়ু দূষণ করে Photochemical smog’র মাধ্যমে। আলোক ধোঁয়াশা বা Photochemical smog হয় সূর্যালোক আর ফেলে দেওয়া এসব মেয়াদহীন ব্যাটারির সাথে বিক্রিয়ায়, যা মানব স্বাস্থ্য ছাড়াও গাছপালা ,পশুপাখির জন্য ক্ষতিকারক।
এই ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকগুলো মানুষের অগোচরে জনস্বাস্থ্য এবং পরিবেশের অকল্পনীয় সর্বনাশ করে যাচ্ছে। খরচ কম, তাই জনগণ ব্যবহার করছে কিন্তু এর ফলাফল কেউ ভাবছে না। ব্যাটারিতে ব্যবহৃত সিসা ধ্বংস হয় না বরং প্রকৃতিতে থেকে যায় । এসব রিকশার অচল ব্যাটারি ভেঙে সিসা বের করার জন্য শিশু ও দরিদ্র মানুষদের নিয়োজিত করে কিছু কোম্পানি—যার মালিকদের ধরা যায় না। শ্রমিকরা ব্যাটারি ভেঙে ভেতরের সিসা পরিষ্কার করতে পানি ব্যবহার করেন। সেই পানি নদী-নালা, খাল-বিল ও কৃষি জমিতে ছড়িয়ে পড়ে পানি ও মাটি দূষণ করে। এই দূষিত পানির জলাশয়ে বেড়ে ওঠা মাছের শরীরে সিসা প্রবেশ করে। আবার সিসাযুক্ত পানি কৃষি কাজে ব্যবহার করলে খাদ্য চক্রের মাধ্যমে সিসার কণা মানবদেহে ও পশু-পাখির শরীরে প্রবেশ করে। ব্যাটারিচালিত প্রতিটি বাহন বছরে “কমপক্ষে ৩০০ কেজি সিসা পরিবেশে যোগ করছে” “সেই হিসাবে ১০ বছরে ৪০ লাখ যানবাহনের মাধ্যমে ১২ বিলিয়ন কেজি সিসা যোগ হচ্ছে।
ব্যাটারী চালিত রিক্সা ও অটোরিক্সা, জনগণ ও ভবিষ্যৎ জনগণের জন্য এক বিপদ সংকেত ! স্বাস্থ্য ও পরিবেশের অকল্পনীয় ক্ষতি কারন ব্যাটারিচালিত রিকশা সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের মত। ব্যাটারিচালিত অবৈধ অটোরিকশার বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর আগে, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সরকারের উচিৎ যত দ্রুত সম্ভব আইন করে এবং আইনের বাস্তব প্রয়োগ করে ব্যাটারী চালিত রিক্সা ও অটোরিক্সা বন্ধ করে সৌর বিদ্যুৎ চালিত রিক্সা ও অটোরিক্সা প্রযুক্তি ব্যবহারে চালকদেরকে সহায়তা করা, নইলে দেশের মানুষ এবং তার স্বাস্থ্য ও পরিবেশ, আগামীতে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে পার করতে হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা ।
লেখক: সমীরণ বিশ্বাস
কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, ঢাকা।



