মাছের পুষ্টির জন্য সকল প্রকার খনিজ উপাদানের ভূমিকা

বাংলাদেশ মাছ চাষে ব্যপক অগ্রগতি করেছে, বিশেষ করে মাছের খাদ্য উৎপাদন বিনিয়োগ যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছে। মাছ চাষে বিনিয়োগের ৬০- ৮০% খাদ্যের জন্য ব্যয় করতে হয়। একথা সত্য যে, খাদ্যের মান উন্নয়নে আমরা প্রভ‚ত উন্নতি লাভ করেছি। তবে খাদ্য তৈরির সময় খাদ্যের সকল ধরণের পুষ্টি মানের মধ্যে খনিজ উপাদানের পরিমান এর গুরুত্বের উপর কিছুটা হলেও শিথিলতা পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে। খনিজ উপাদানের মধ্যে ট্রেস মিনারেল উপর কিছুটা গুরুত্ব দেয়া জরুরী। ইদানিং মাছের রোগ বালাই সহ নানাবিধ নুতন নুতন সমস্যা দেখা দিচ্ছে, যা মাছের সঠিক পুষ্টিমানের নিয়ন্ত্রনের মাধ্যমে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। মাছের দেহে মেক্রো , মাইক্রো ও ট্রেস মিনারেল এর গুরুত্ব অপরীসিম যার কিছু প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হলো।

সব ধরনরে জলজ প্রানীর ও মাছের স্বাভাবিক জীবন প্রক্রিয়রি জন্য অজৈব উপাদান বা খনিজের প্রয়োজন হয়। অধিকাংশ স্থলজ প্রানীর বিপরীতে মাছে কেবল খাদ্য থেকেই নয়, বরংচ তাদের বাইরের পরিবেশ থেকে (মিঠা পানি বা লবনক্ত পানি উভয় ক্ষেত্রেই) কিছু অজৈব উপাদান শোষণ করতে সক্ষম। অনেক প্রয়োজনীয় উপাদান এত অল্প পরিমানে প্রয়োজন হয় যে খনিজ সমৃদ্ধ খাদ্য বা ডায়েট তৈরি করা এবং প্রয়োজনীয় ঘাটতির যোগান দিতে খনিজ সমূহ জলজ পরিবেশে বজায় রাখা বেশ কঠিন। যদিও খাদ্যর মাধ্যমে খনিজ উপাদান সরবরাহে অনেক অগ্রগতি হয়েছে, তবুও বেশীরভাগ গবেষণা অজৈব উপাদানের গ্রহনের পরিমান নিয়ে সীমাবদ্ধতা আছে এবং পানিতে খনিজ লবনের সমতা রক্ষা করা (ওসমোরেগুলেশন প্রসেস এর জন্য), শাররীক টক্সিসিটি ও যাবতীয় শারীরবৃত্তীয় কার্যকলাপের মধ্যে পানিতে দ্রবীভূত খনিজ উপাদানের ব্যপক ভূমিকা আছে।

মাছ সহ অন্যান্য সকল প্রাণীর দেহে অধিকাংশ খনিজ উপাদান বিদ্যমান থাকে। প্রাকৃতিতে ৯০ টি মৌলের মধ্যে ২৯ টি প্রাণীর জীবনের জন্য অপরিহার্য বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। মাছ সহ সকল প্রাণীর শরীরের বড় অংশ ছয়টি খনিজ উপাদান নিয়ে গঠিত যা হল কার্বন. হাইড্রোজেন, নাইট্রোজেন, অক্সিজেন, ফসফরাস এবং সালফার যেগুলো উচ্চ মাত্রায় প্রয়োজন হয়। তাছাড়াও ৫ টি মেক্রো খনিজ উপাদান -ক্যালসিয়াস, ম্যাগনেসিয়াম, সোডিয়াম, পটাশিয়াম এবং ক্লোরিন এর প্রয়োজন হয়। এর বহিরে কিছু পরিমান খনিজ উপাদান খুবই কম পরিমানে লাগে, এসকল উপাদান সঠিক ভাবে পরিমান করা যায়না যা মিলিগ্রাম বা মাইক্রোগ্রামে পরিমান করা হয় , এসকল উপাদানকে স্ট্রেস এলিমেন্ট বা ক্ষুদ্র উপাদান হিসাবে বর্ননা করা হয়। বর্তমানে টেকনোলজির দিনে এ সকল উপাদানকে ও সঠিক ভাবে হিসাব করা সম্ভব। যার ফলে মাছের বিপাকীয় প্রক্রিয়ার স্টেস মিনারেল এর ভ‚মিকা সর্ম্পকে ধারনা এবং খাদ্য তৈরিতে নিউট্রেশন এর পারমান নিয়ে সিদ্ধান্তে আসা যায়।

অতি প্রয়োজনীয় খনিজ মাছের বা জলজ প্রাণীর খুবই গুরুত্বপূর্র্ণ যার অনুপস্থিতি জলজ প্রাণীর মৃত্যু ঘটতে পারে এবং শারীরবৃত্তীয় কার্যকলাপে ব্যঘাত ঘটে যা খাদ্যের মাধ্যমে নির্ধারিত মাত্রায় সরবরাহ করে ঘাটকি পুরন করা যায়। প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদানের অভাবে মাছের বৃদ্ধি ব্যহত হয় এবং প্রতিটি প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান সরাসরি বিপাকীয় কার্যের সাথে জড়িত। বর্তমানে খাদ্য তৈরির সময় প্রোটিন এর মানের সাথে প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদানের ভারসাম্য খাদ্যের মানের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত, যদিও খাদ্য তৈরির ফলে সকল প্রয়োজনীয় উপাদানের মান নিয়ন্ত্রন সঠিক ভাবে পরীক্ষা করার ক্ষেত্রে দুর্বলতা রয়েছে ।

মাছের জন্য ১৫ টি উপাদানকে ট্রেস উপাদান হিসাবে ধরা হয় যা মাছের বৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য। এদের মধ্যে ক্রোমিয়াম, কোবাল্ট, কপার, ফ্লোরিন, আয়োডিন, আয়রন, ম্যংগানিজ, মলিবডেনাম, সেলেনিয়াম এবং জিংক এর ঘাটতি মাছের শরীরবৃত্তীয় কার্যকলাপে সুনিদৃষ্ট প্রভাব ফেলে। নিকেল, বেনেডিয়া,, সিলিকন, আর্সেনিক এর ঘাটতি ও মাছের খাদ্য উপাদানেও ঘাটতি পরিলক্ষিত করা গেছে। তবে সিলিকন ব্যতিত অন্যান্য উপাদান যেমন নিকেল, বেনেডিয়াম, আর্সেনিক এর কার্যকরিতা মাছের দেহে একখনও সুনিদৃষ্ট ভাবে প্রমানিত নয়। বর্তমান গবেষনায় ক্যাডনিয়াম, লেড এবং ব্রোমিন ও অপরিহার্য উপাদান হিসাবে দাবী করা হয়েছে। সকল ট্রেস উপাদান মাছের দেহে পাওয়া গিয়েছে এবং কেবল কিছু উপাদানই অপরিহার্য হিসাবে প্রমানিত হয়েছে।

নিচের ছকে মাছের ট্রেস মিনারেল এর সাথে এনজাইম এবং শরীরবৃত্তীয় কাজের বর্ননা দেয়া হল:

ট্রেস মিনারেলএনজাইমপ্রয়োজনীয় কাজ
আয়রনসাক্সিনেট ডিহাইড্রোজেনেজস, সাইটোক্রোম যা প্রোটিন যুক্ত ইলেকট্রন পরিবহন করে , ক্যাটালেচ (যা হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড কে ভেংগে পানিতে রুপান্তরিত করে)কার্বোহাইড্রেটযুক্ত অক্সিজেনের জারণ, ইলেকট্রন ট্রান্সফার, হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড থেকে রক্ষা
কপারসাইটোক্রোম অক্সাইড, লায়সাইল অকক্সাইড, ফেরোঅক্সাইড, সুপারঅক্সইড ডিসমুটেসটারমিনাল অক্সিডেসন,লাইসিন অক্সিডেসন, আয়রন এর শোষণ, পারঅক্সাইড এর ফ্রি রেডিক্যাল এর ডিসমিউটেশন
জিংককার্বনিক এনহাইড্রেট, এলকোহল ড্রি হাইড্রোজেনেসিস, কর্বোক্সিপেপটাইজেজ, এলকাইন ফসফেট, পলিমারেজ, কোলিজেনেসিস।কার্বনডাইঅক্সাইড ফরমেশন, এলকোহল মেটাবলিজম, প্রোটিন ডাইজেশন, ফসফেট এর হাইড্রোলাইসিস, ডিএনএ ও আরএন এর সেনথিসিস, রক্তপাত বন্ধ হওয়া।
ম্যাংগানিজপাইরোবেট কার্বোজাইলেজ
,সুপারঅক্সাইড ডিসমুটেজ
পাইরোভেট মেটাবলিজম
সুপরাঅক্সাইড এর ফ্রিরেডিকেল এরডিসিম্যুটেশন। প্রোটিওলাইক্যান এর সিনসেথিস
মলিবডেনামজেনথিন ড্রিহাইড্রোজেনেস, সালফাইট অক্সাইড,এলডিহাইড অক্সাইডপিউরিন মেটাবলিজম, সালফাইট আক্সডেশন
সেলিনিয়ামগ্লুটাথিওন পারঅক্সাইড, টাইপ ১ এবং ২ ডিওডাইনেসহাইড্রোজেন পারঅক্সাইড এর নির্সরন, থাইরোডক্সিন সংশ্লেষণ।

সেলিনিয়াম গ্লুটাথিওন পারঅক্সাইড, টাইপ ১ এবং ২ ডিওডাইনেস। হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড এর নির্সরন, থাইরোডক্সিন সংশ্লেষণ।
মাছের দেহে অপরিহার্য উপাদানের প্রয়োজনীয় কাজ হল মাছের কংকাল/হাড় গঠন, কলোয়েডাল সিস্টেম বজায় রাখা (যেমন: রক্তে ওসমোটিক চাপের সান্দ্রতা এবং বিক্ষিপ্ততা বজায় রাখা) এবং এসিড বেইস সমতা নিয়ন্ত্রণ। সবচেয়ে বিবেচ্য বিষয় হল প্রয়োজনীয় মিনারেল হরমোন, এনজাইম ও এনজাইম অ্যাক্টিভেটের গুরুত্বপূর্ন উপাদান। ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস শরীরের হড় গঠনের জন্য প্রয়োজনীয়, সাধারনত খাদ্য তৈরিতে এর গুরুত্বই বেশী দেয়া হয়। সোডিয়াম, পটাসিয়াম, ক্লোরাইড ও ফসফেট দেহের স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় রাখে এবং এসিড ক্ষারীয় সমতা রক্ষা করে।

নির্ধারিত কিছু ট্রেস মিনারেল যেমন: আয়রন, ম্যাংগানিজ, কপার, কোবাল্ট, জিংক ও মলিবডেনাম, সেলিনিয়াম ইত্যাদির ভূমিকাও দেহের ভারসাম্য ও এসিড ক্ষারীয় সমতা রক্ষায় ভূমিকা রয়েছে। সকল প্রকার ট্রেস মিনারেল কিছু প্রোটিনের সাথে দৃঢ়ভাবে যুক্ত, যা মাছের মেটাবলিজমে একটি অনন্য অনুঘটক হিসাবে কাজ করে। কিছু খনিজ উপাদান যেমন ম্যাংগানিজ, ক্যালসিয়মি ও ম্যাগনেসিয়াম যা এনজাইম সক্রিয়কারক হিসাবে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আয়রন ও আয়োডিন হরমোন বায়োসেনথেসিসের জন্য প্রয়োজনীয় যা মাছের কশেরুকা বিকাশ ও পরিপাকক্রিয়াকে ব্যপকভাবে প্রভাবিত করে।

মাছের খনিজ প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণে অসুবিধাসমূহ:


সাধারনত ট্রেস মিনারেল এর মান নির্ধারন করা জটিল ব্যপার এবং কষ্টসাধ্য । মাছের গিল ও ত্বক দিয়ে মাছ জলজ পরিবেশ থেকে আয়নের আদান প্রদান করে যা একটি জটিল প্রক্রিয়া , অনেক ট্রেস উপাদান যা খুবই সামান্য পরিমানে প্রয়োজন হয় যা মাছ্যের খাদ্য ও পরিবেশে বজায় রাখা বেশ কষ্টকর । মাছের খাদ্য তৈরিতে এর মাত্রা ও মান পরীক্ষাগারে নির্নয় করা যায়, কিন্ত ব্যয়বহুল, তবে মাছের বয়স ও দৈহিক ওজন অনুসারে মাছের শরীরে বা টিসুতে ট্রেস মিনারেল এর মাত্রা নির্ধারন করা এখনো কষ্টসাধ্য। বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যায় যে মাছের টিসুতে ট্রেস উপাদানের মান নির্ধারন এর মাত্রা ভিন্নতা পাওয়া গিয়াছে যা থেকে কোন নির্ধারিত সিদ্ধাতে আসা কঠিন। ট্রেস উপাদানের পুষ্টিগত অবস্থা নির্ধারনের জন্য মাছের বয়স, লিঙ্গ, স্বাস্থ্য ও শারীরবৃত্তিয় অবস্থা (যেমন, স্মল্টিফিকেশন ও যৌন পরিপক্কতা) সম্পর্কেও তথ্য প্রয়োজন।

(চিত্র: নিউট্রেশন এর জৈবিক মাত্রা গ্রহন চিত্র। যা মাছের প্রয়োজনীয় মিনারেল এর গ্রহন মাত্রা নির্ধারিত হয়।)

ট্রেস উপাদানের পুষ্টিগত অবস্থার সবচেয়ে প্রচলিত পরিমাপক হলো-রক্ত, মাংসপেশি, যকৃত ও হাড়ে এর মাত্র ,অনেক প্রয়োজনীয় উপাদানের ক্ষেত্রে, টিস্যুতে একটি নির্দিষ্ট মাত্রার পরিসর থাকে মাছের বৃদ্ধি ও স্বাভাবিক কার্যকারিতার জন্য উপযুক্ত। যদি খনিজ গ্রহন কমতে থাকে তবে মাছের টিস্যুতে এর ঘনত্ব কমতে থাকে, যার ফলে মাছের বিভিন্ন অঙ্গের কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে থাকে এবং পর্যায়ক্রমে বিষক্রিয়া দেখা দেয় এবং এর মাঝামাঝি পর্যায়টি নির্ধারণ করা জটিল

ট্রেস মিনারেল ঘাটতিতে করনীয়:


ইদানিং মাছের রোগ বালাইয়ের পরিমান বৃদ্ধি পাছে , অনেক ক্ষেত্রে মাছের নুতন নুতন রোগের লক্ষণ দেখা দিচ্ছে । বাস্তবতা হল আমাদের দেশে মাছের খাদ্যের গুনগত মান বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এটাও বাস্তবতা যে মাছ চাষে চাষীরা বিভিন্ন সমস্যার সুম্মুখীন হচ্ছে। যারা মাছের খাদ্য তৈরি ও এর পুষ্টি নিয়ে কাজ করছে তাদের কে ট্রেস মিনারেল নিয়ে আরো গুরুত্ব দিতে হবে, প্রয়োজনে মাঠ পর্যায়ে গবেষনা পরিচালনা করা যেতে পারে। আমরা বিশ্বের প্রথম শ্রেনীর মাছ উৎপাদনকারী দেশ বিশেষ করে, এ সেক্টরে বিনিয়োগের পরিমান অনেক বেশী তাই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসাবে মাছের খাদ্যে মিনারেল তথা ট্রেস মিনারেল এর জন্য সবাই একসাথে কাজ করতে হবে এবং বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।


লেখকঃ মনছুর আলম (দীপু)
এমএস (মেরিন সায়েন্স)
এমএস (অ্যাকুয়িটিক রিসোর্স ডেভলপমেন্ট), ষ্টারলিং
জিএম (ইয়ন অ্যাকোয়াকালচার লি:)