চিংড়ি চাষে ওসমোরেগুলেশনের তাৎপর্য ও সমাধান

চিংড়ি চাষ একটি বাস্তব প্রায়োগিক বৈজ্ঞাানিক কার্যক্রম, সাধারনত সকল প্রকার অ্যাকোয়িটিক প্রাণির মধ্যে চিংড়ি চাষ একটু ব্যতিক্রমী তাৎপর্য বহন করে, যা সার্বক্ষনিক তদারকি এবং ভৌত রাসায়নিক উপাদানের তারতম্যের রেকর্ড ও সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হয় । আমাদের দেশের উপকূলীয় পরিবেশ যা বাগদা, গলদা ও ভেনামী চিংড়ি চাষের জন্য খুবই উপযোগী । দেশের এই সুবিশাল সামুদ্রিক উপকূলে রয়েছে পরিবেশগত তারতম্য যা চিংড়ি চাষের জন্য বিশেষ সুবিধা বহন করে । যদিও আমাদের দেশে সরকারের সার্বিক উন্নয়ন সহযোগীতা , টেকনোলজির আধুনীকরনসহ সার্বিক দুর্বলতার জন্য আমরা চিংড়ি চাষে অনেক পিছিয়ে পরেছি এবং সঠিক উৎপাদন সম্ভব হয়ে উঠছে না । চিংড়ি চাষে পানির আয়নিক কনসেনট্রেশন অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়, যার উপর অনেকআংশে নির্ভর করে চিংড়ির উৎপাদন ব্যবস্থাপনা।

অসমোরেগুলেশন কি


ওসমোরেগুলেশন হল পানিতে আয়নের ভারসাম্য , বিশেষ করে সকল প্রকার চিংড়ির জন্য একটি জরুরী জৈব রাসায়নিক পক্রিয়া , যা পানিতে বিভন্ন প্রকার দ্রবীভূত ধনাত্বক (ক্যাটায়ন) ও ঋণাত্মক (অ্যনায়ন) আয়নের সঠিক পরিমান বা মাত্রা বুঝায় । পানিতে ইলেকট্রিক্যল নিউট্রিলিটি বজায় থাকে যা সাধারনত প্রাকৃতিক ভাবেই সম্পন্ন হয়ে থাকে । ইলেকট্রিক্যল নিউট্রিলিটি বজায় থাকার জন্য চিংড়ি সরাসরি পানির আয়নের উপর নির্ভর করে এবং তাদের মৌলিক শরীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া ও জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য পানির আয়ন এবং চিংড়ি শরীরের আভ্যন্তরিণ আয়নের ভারসাম্য বজায় রাখার পক্রিয়াটিকে বলা হয় ওসমোরেগুলেশন । ওসমোরেগুলেশন যা পানির লবনাক্ততার উপর নির্ভরশীল নয়, কারন এটিকে মোট লবনের পরিমান বুঝানো হয় না, বরং ওসমোরেগুলেশন হল চিংড়ি চাষ পুকুরের মূল আরনগুলোর সঠিক অনুপাতের বিষয় । চিংড়ি তার জৈব ও রাসায়নিক পক্রিয়ায় অভ্যন্তরীন পরিবেশ (যেমন: হেমোলিম্ফ ও রক্ত) এবং চাষকৃত পুকুরের পানির মধ্যে আয়নের ভারসাম্য বজায় রাখতে খুবই কম পরিমান শক্তি ব্যবহার করে থাকে । যদি কোন কারনে পুকুরের পানিতে আয়নের ঘাটতি বা ভারসাম্যহীনতা থাকে তাহলে চিংড়িকে অতিরিক্ত পরিমান শক্তি ব্যবহার করতে হয় যা চিংড়িকে সামাল দিতে হয় , অতিরিক্ত পরিমান শক্তি ব্যবহার করার ফলে শক্তির অপচয় হয় এবং চিংড়ি দ্রæততম সময়ে ধকল/পীড়নে পড়ে এবং রোগাক্রান্ত হবার ঝুকি বেড় যায় । চিংড়ির ব্যপক মরটালিটি দেখা দিতে পারে যা ব্যবস্থাপনা করা অনেক ক্ষেত্রে কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে ।

লবণাক্ত পানিতে যে সকল আয়নের অধিক্য থাকে


নাইট্রেট (NO₃⁻)০.১-১ মি.গ্রাম/লি:,নাইট্রাইট (NO₂⁻)০.০০১-০.৫ মি.গ্রাম /লি:.অ্যামোনিয়া (NH₃)০.০১-২.৫ মি.গ্রাম /লি:,ফসফেট (PO₄³⁻)০.০১-২.০,সিলিকেট (SiO₄⁴⁻)০.১-৫০ মি.গ্রাম /লি:, দ্রবীভূত অর্গানিক কার্বন (DOC)১-২০ মি.গ্রাম /লি:,টিডিএস (TDS)১০০০-১০,০০০ মি.গ্রাম /লি:, ক্লোরাইড (Cl⁻), সোডিয়াম (Na+,),  ম্যাগনেসিয়াম (MG+) , ক্যালসিয়াম (Ca+), পটাসিয়াম (K+) সালফেট (SO₄²⁻), , বাইকার্বনেট (CO3-²).

ওসমোরেগুলেশন পক্রিয়া


চিংড়ি তার গিলসের মাধ্যমে সক্রিয়ভাবে আয়ন শোষণ ও নি:সরণ করে শরীরের অভ্যন্তরীণ লবণের ঘনত্ব বজায় রাখে । এই কাজটি সেলের বিশেষ প্রক্রিয়ার পাম্প এবং এনজাইম দ্ধারা নিয়ন্ত্রিত হয় । চিংড়ি চাষ পুকুরে পটাসিয়াম এবং ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতি এবং সঠিক মাত্রা বা অনুপাত না থাকলে চিংড়ি বিশেষ পাম্প প্রক্রিয়াটি সঠিক ভাবে করতে পারে না এতে চিংড়ি তীব্র ওসমোটিক ট্রেস এ পড়ে ব্যপক মৃত্যু হয়ে থাকে ।

মোল্টিং


চিংড়ি চাষে মোল্ট্রিং একটি গুরুত্বপূর্ন প্রক্রিয়া এই প্রক্রিয়া সঠিক সময় এবং নিয়মিত না হলে চিংড়ি স্বাভাবিক বৃৃদ্ধি ব্যপক হারে ব্যহৃত হয় এবং রোগের অক্রমণ হবার ঝুকি বেশী থাকে । চিংড়ির খোলস পাল্টানোর পর ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামের ভূমিকা অপরিহার্য এবং এই দুটি আয়নের আনুপাত সঠিক না থাকলে ক্যানাবলিজম (সমপ্রজাতি ভক্ষণ) বেশী হয় , চিংড়ি দুর্বল হয়ে পড়ে, চিংড়ি জীবাণু দ্ধারা দ্রুততম সময়ে আক্রান্ত হয়ে পড়ে ।

মেটাবলিক ও মাংসপেশীর কার্যক্রম


চিংড়ি চাষ পুকুরের পটাসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম যা এনজাইম ও স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ন ভ‚মিকা পালন করে । পটাসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম এর অভাবে চিংড়ি ভারসাম্যহীন ভাবে ঘোড়াফেরা, খাবার গ্রহন কমে যাওয়া এবং বিপাকীয় কার্যক্রমে ব্যহত করে ।

পানির লবনাক্ততা নয় বরং পানির আয়নের ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ন


বাগদা এবং ভেনামী উভয় প্রকার চাষযোগ্য চিংড়ি ১-৪০ পিপিটি লবন পর্যন্ত সহ্য করতে পারে । তবে এই বিশাল লবনক্ততার পার্থক্য বা সহনশীলতা নির্ভর করে পানি কতটা আয়নগতভাবে ভারসাম্য যা প্রকৃতিক পানির উৎস্য সাগরের পানির মত । ঘের বা চিংড়ি চাষ পুকুর প্রাকৃতিক ভাবে কতটা আয়নিক ভারসাম্যপূর্ন বা কিভাবে পুকুরের ভারসাম্য বজায় রাখা যায় পুুকুরে বাইরে থেকে আয়ন প্রয়োগ করার মধ্য দিয়ে এটা খুবই তাৎপর্যবহন করে ।

কম লবনাক্তায় চিংড়ি চাষ


সাধারনত কম লবণাক্তাতার পানিতে আয়ন তথা পটাসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতি থাকে । ক্যালসিয়াম ও বাইকার্বনেট এর পরিমান বেশী থাকে, এমন অবস্থায় চিংড়ির প্রয়োজনীয় পরিমানে আয়নের সরবরাহ সঠিক মাত্রায় থাকেনা, যার ফলে চিংড়ি চাষীরা বিশেষ অসুবিধার সম্মুখীন হয়, উৎপাদন ব্যপক হারে ব্যহৃত হয় । প্রয়োজনীয় আয়নের অভাবে আয়নিক শখ হয়, মরটালিটি বৃদ্ধি পায়, খাবারের অপচয় হয় । এ সকল কারনে চিংড়ি চাষ পুকুরের রিমিনারালাইজ করে আয়নের ঘাতটি পুরণ করা হয় । চিংড়ি চাষের ক্ষেত্রে সার্বিক বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে বিবেনায় আনতে হবে ।


লেখকঃ মনছুর আলম (দীপু)
এমএসসি (মেরিন সায়েন্স)
এমএ (অ্যাকোয়েটিক রিসোর্স ডেভলপমেন্ট), স্টারলিং ।
কনসালটেন্ট অ্যাকোয়িটিক রিসোর্স ডেভলপমেন্ট
জিএম (ইয়ন অ্যাকোয়াকালচার লি:)